আজ, রবিবার | ৮ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | রাত ১১:০২

ব্রেকিং নিউজ :
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার মাগুরায় আওয়ামী লীগ কার্যালয় উদ্বোধনের আধাঘণ্টা পর আ/গুন, তিন নেতা-কর্মী আটক মাগুরায় বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন মাগুরায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল মাগুরায় খুচরা সার বিক্রেতাদের মানববন্ধন; প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি মাগুরা-১ আসনের এমপির রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ মাগুরার ছেলে জাহিদুল ইসলাম রনি প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব নিযুক্ত স্বাধীনতার মার্চ: অপারেশন সার্চলাইট থেকে বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা জনগণের কথা জানতে মাগুরায় ৯টি অভিযোগ বাক্স স্থাপন মাগুরায় শোভাযাত্রায় নিতাই রায় চৌধুরী ও মনোয়ার হোসেন খানের অভ্যর্থনা

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার

লায়লা আরিয়ানি হোসেন : সবকিছুর শুরু হয় ঘর থেকে। শিশুর জন্য ঘর, তারপর পরিবার, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন। এরপর স্কুল, ক্রমান্বয়ে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং একসময় কর্মক্ষেত্র। এই প্রতিটি জায়গায় যারা উপস্থিত থাকেন, তারা সবাই মিলে যদি কন্যা ও নারীর সুরক্ষায় সচেতন থাকেন, তবে সম্মিলিত চেষ্টায় অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য— “আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায়বিচার; সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার।”

আগামীর কথা ভাবতে হলে মনোযোগ দিতে হবে বর্তমানের দিকে। তবে তার আগে একটু ফিরে দেখা যাক শুরুর ইতিহাস।

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের সূচনা মূলত নারীর ন্যায্য অধিকার এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিকে কেন্দ্র করে। ১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং অমানবিক কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতাকল কারখানার নারী শ্রমিকরা।

১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের উদ্যোগে একটি নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে ১৭টি দেশের প্রায় ১০০ জন নারী প্রতিনিধি অংশ নেন। সেই সম্মেলনেই ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন। অবশেষে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়।

এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীর অধিকার শুধু একটি স্লোগান নয়, কেবল একটি দিনও নয়। এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। ঘরে-বাইরে শিক্ষা, নিরাপত্তা, সম্মান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং সমান সুযোগ—এসবই নারীর অধিকারের অংশ। আমরা যদি দেশটিকে নিজের বলে ভাবতে পারি এবং প্রতিটি মানুষকে মানবিক মর্যাদায় মূল্যায়ন করতে পারি, তবে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের সমাজ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। স্কুল থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে মেয়েদের উপস্থিতি বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষাগত সাফল্যে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। কর্মক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীর উপস্থিতি ও সাফল্যও ক্রমেই বাড়ছে। তবুও বাস্তবতার আরেকটি চিত্র রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, বাল্যবিবাহ, অনলাইন হয়রানি এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো সমস্যা এখনো অনেক মেয়ের পথ আটকে দেয়। ফলে নারীর অগ্রগতি কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের সংগ্রামের গল্প।

বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েরা পরিবার থেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। সন্তানদের মধ্যে ছেলে-মেয়ের প্রতি ছোট-বড় নানা বিষয়ে বৈষম্যমূলক আচরণ এখনো বিদ্যমান। এখনো অনেক ক্ষেত্রে মনে করা হয়, সংসারের ঘরের কাজ মেয়েদেরই করতে হবে। কন্যাশিশুর শিক্ষা অনেক সময় সামাজিক মর্যাদা রক্ষার আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়।

নারীর জীবন শুরু হয় কন্যা হয়ে। তাই নারীর অধিকার রক্ষার প্রথম ধাপ হলো কন্যাশিশুর জন্য প্রকৃত শিক্ষার পথ উন্মুক্ত করা। বাস্তবমুখী শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়ন—এসব নিশ্চিত করা উচিত শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ কৃষিখামার থেকে শুরু করে শহরের অফিস, ব্যাংক ও হাসপাতাল—সবখানেই নারীর শ্রম সমাজকে এগিয়ে নিচ্ছে। অনেক নারী উদ্যোক্তা নিজের উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করছেন এবং কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। এটি প্রমাণ করে—সুযোগ পেলে নারীর সক্ষমতা সমাজের গতিকে বদলে দিতে পারে। তাই কর্মক্ষেত্রে এবং চলার পথে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই দায়িত্ব শুধু একজনের নয়; এটি আমাদের সবার।

অনেক পরিবার এখনও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। স্কুলে যাতায়াতের পথে উত্যক্ত হওয়া বা অনিরাপদ পরিবেশের আশঙ্কা অনেক সময় মেয়েদের শিক্ষাজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এতে তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। নিজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে পছন্দের পেশায় টিকে থাকতে পারেন না—যাতায়াতের ঝুঁকি, কর্মস্থলের অনিরাপদ পরিবেশ কিংবা রাতের শিফটে কাজ করার আশঙ্কার কারণে।

অনিরাপদ পরিবেশ মানুষের মনে অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করে। অনেক নারী এক ধরনের অস্বস্তি, শঙ্কা এবং মানসিক চাপ অনুভব করেন, যা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। ফলে নিজের মতামত প্রকাশ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও দ্বিধা তৈরি হয়।

এই নিরাপত্তাহীনতা সামাজিক জীবনেও প্রভাব ফেলে। অনেক নারী সাংস্কৃতিক, সামাজিক কিংবা নাগরিক কার্যক্রমে অংশ নিতে সংকোচ বোধ করেন। বাইরে চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যায়। ফলে তাদের প্রতিভা ও সম্ভাবনা পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না। এর পাশাপাশি অনিরাপদ পরিবেশে শারীরিক, মানসিক এবং অনলাইন সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ে।

অধিকার রক্ষার লড়াই শুধু নারীর একার দায়িত্ব নয়। এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। একটি পরিবার যখন কন্যাশিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেয়, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে এবং একটি কর্মক্ষেত্র যখন সমান সম্মান নিশ্চিত করে, তখনই ন্যায়বিচারের ভিত্তি শক্ত হয়।

ডিজিটাল যুগে আরেকটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নারীদের মত প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে, আবার একই সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে। তাই অনলাইন নিরাপত্তাও এখন নারীর অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক দায়িত্ব—এই তিন ক্ষেত্রেই কাজ বাড়াতে হবে।

আজকের নারী যে পথে এগিয়ে চলেছে, সেই পথ একদিন তৈরি করেছিলেন দূরদর্শী মানুষরা। তারা ভবিষ্যৎ ভেবেই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আজ আমাদের পালা। আমাদের প্রত্যেকেরই ভাবা দরকার—আমি কী করতে পারি? আমার আশেপাশের নারী ও কন্যাশিশুর জন্য আমি কী করছি?

আজকের একটি সিদ্ধান্ত, একটি প্রতিবাদ, একটি সচেতন উদ্যোগ—এসবই আগামীর ন্যায়বিচারের পথ তৈরি করে। যখন একটি মেয়ে দ্বিধাহীনভাবে পড়াশোনা, খেলাধুলা বা নিজের পছন্দের কাজে অংশ নিতে পারে, নিজের স্বপ্ন বেছে নিতে পারে এবং নিজের মত প্রকাশে দৃঢ় হতে পারে—তখনই সমাজ সত্যিকার অর্থে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অধিকার মানুষের প্রাপ্য। আজকের সচেতনতা, আজকের উদ্যোগ এবং আজকের দৃঢ় অবস্থানই আগামীর সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করে তুলবে।

যেখানে একটি কন্যাশিশুর হাসি মানে একটি পরিবারের আশ্বাস,
যেখানে সমাজের ভরসা একজন নারীর আত্মবিশ্বাস,
প্রতিশ্রুতি হোক—নারী ও কন্যার অধিকার থাকবে নিরাপদ,
তাদের স্বপ্ন পাবে বিস্তার, কণ্ঠ হবে দৃঢ় ও স্বাধীন,
নারীর চোখে স্বপ্ন পাবে ঠিকানা প্রতিদিন।

# লায়লা আরিয়ানি হোসেন, বেতার কর্মী ও লাইফ কোচ

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology